১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির আশা

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎ 

আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধী দলীয় (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মো. নুরুল ইসলামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কষ্টে আছে। এই পরিস্থিতির জন্য সরকার শুধু কথার আড়ালে প্রকৃত সত্য লুকাতে চায় না। ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ শুধু গ্যাস দিয়ে উৎপাদন করতে হলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অথচ দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে বর্তমানে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। সব গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করলে শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হবে। তাই বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি- এ তিন খাতের মধ্যে ভারসাম্য রেখে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। একই ক্ষমতার মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরেকটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। এ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আদানির সঙ্গে বিগত সরকারের করা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য দেশে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি গত ২১ জুলাই ত্রুটিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ২১ থেকে ২২ দিন মেরামতে সময় লেগেছে। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় ৮৮ শতাংশ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী মাসের শুরুতেই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক করার আশা করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্প ও গৃহস্থালি গ্রাহকরাও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাবেন এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ফার্নেস অয়েল থেকে উৎপাদনের কথা বলা হলেও বাস্তবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট হওয়ায় একটানা চালানো যায় না। সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় এসব কেন্দ্র পরিচালনা করা সম্ভব। ফলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

তিনি জানান, বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। বিগত সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের পুঞ্জীভূত বকেয়া হিসেবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই অর্থ পরিশোধ করা হলে কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পায়রা ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করতে সরকার কঠোর নজরদারি করছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত দেড় যুগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভুল নীতি গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। একই সময়ে বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায়ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আবহাওয়াজনিত কারণ ছাড়াই গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বলেন, তার এলাকায় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ এবং তার দাবি অনুযায়ী গত ৫৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ঘাটতি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ এবং ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কতদিনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা জানতে চান তিনি।

জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগস্ট মাসে জনগণকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, অন্তত সেপ্টেম্বর মাসে যাতে তা না হয়, সে জন্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অস্বস্তিকর হলেও জনগণকে প্রকৃত তথ্য জানানো সরকারের দায়িত্ব। সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে এবং দ্রুতই এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *