✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
রাজধানীর মালিবাগ, শ্যামলী ও হাজারীবাগ এলাকার কয়েকটি বিভিন্ন মসজিদ, এতিমখানা ও স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে সংগ্রহ করা চামড়া রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিক্রেতারা।
মালিবাগ এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ী আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘ট্যানারি মালিকরা আগেই বলে দিয়েছেন বেশি দামে চামড়া নেবেন না। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনলে পরে লোকসান হবে।’
আরেক ব্যবসায়ী সোহেল মিয়া ছাগলের চামড়ার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘ছাগলের চামড়া তো প্রায় কেউ নিতে চাচ্ছে না। অনেকে বিনামূল্যেও দিয়ে দিচ্ছেন। সংরক্ষণ খরচ তুলতেই কষ্ট হবে।’
তবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, চামড়ার বাজার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। হাজারীবাগ এলাকার এক আড়তদার বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি পিসে ৫০-৬০ টাকা বেশি দামে চামড়া কেনা হচ্ছে। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক সময় সঠিকভাবে লবণ না দেওয়ায় দাম কমে যায়।
প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করছে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। পরে এসব চামড়া কিনে নেন আড়তদার ও ট্যানারির প্রতিনিধিরা।
এর আগে গত ১৩ মে চামড়া খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে সরকার। নির্ধারিত দামে ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য ধরা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।
সে হিসেবে ছোট আকারের গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। মাঝারি আকারের চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের চামড়ার দাম ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই দাম মিলছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, ট্যানারি পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব, সংরক্ষণ সংকট ও নগদ অর্থের ঘাটতির কারণে প্রতিবছরের মতো এবারও মাঠপর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। আর কোরবানিযোগ্য পশুর সরবরাহ সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি। এ বছর চাহিদা রয়েছে এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এই চামড়ার ৬০ ভাগের বেশি সরবরাহ মেলে কোরবানির মৌসুমে। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া।
সরকারের যত উদ্যোগ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চামড়া যেন নষ্ট না হয় এবং দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পে যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যে সারা দেশে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে মাদ্রাসা, এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য চামড়া সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বিভাগীয় কমিশনারদের বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন এবং জেলা প্রশাসকদের প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তদারকির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে জুমার নামাজে দেশের সকল মসজিদে খতিব ও ইমামদের খুতবা ও বক্তব্যে চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি কাঁচা চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় সরকার দেশব্যাপী মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ১৭ কোটির অধিক টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা এবং জেলা পর্যায়ে ৭৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চামড়া সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। টেলিভিশন, রেডিও, জাতীয় পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমেও প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ঈদের তিন দিন আগে থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সচেতনতামূলক তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়।
এদিকে সরকার এবার লবণযুক্ত গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বাড়িয়েছে। এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ টাকা থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ টাকা থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সারা দেশে খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং সারা দেশে বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা যদি পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ এ বছর একটি চামড়াও নষ্ট হবে না। দেশের এই মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।’
ট্যানারিগুলোর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৭০ লাখ পিস চামড়া, সরবরাহ কম হওয়ার আশঙ্কা
সমকালের সাভার প্রতিনিধি জানান, সাভারের বিসিক শিল্পনগরীর ট্যানারিপল্লিতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারীরা অর্থাৎ পাইকাররা ট্রাকে করে চামড়া সরবরাহ করছেন। ইতিমধ্যে ট্যানারিতে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন ট্যানারি মালিকরা। তবে বিগত দিনের চেয়ে এ বছর চামড়া সরবরাহ কম বলে ট্যানারির একাধিক মালিক সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার দেশে প্রায় এক কোটি পশু কোরবানি হতে পারে। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পশুর চামড়া এ ট্যানারির বিভিন্ন শিল্পকারখানায় সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন ট্যানারির মালিকরা। এছাড়াও কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণ ও কেমিক্যালের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছেন তারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের হরিণধারা এলাকায় ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। পর্যাপ্ত লবণ ও কেমিক্যাল মজুত করা এবং জমে থাকা পুরোনো বর্জ্য অপসারণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে।
তরল বর্জ্য শোধনের জন্য সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) পরিষ্কার ও সংস্কার করে সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ঈদের দিন দুপুর থেকে ট্যানারিগুলোতে পশুর চামড়া আসা শুরু হবে। সেজন্য মৌসুমি শ্রমিকদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এবিসি ট্যানারির মালিক ইমাম হোসেন জানান, ট্যানারিগুলোর সক্ষমতা অনুযায়ী চামড়া কেনা হবে। তবে অতিরিক্ত গরম ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও জানান, ঈদকে সামনে রেখে পর্যাপ্ত লবণ মজুত করেছেন তারা।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি শাখাওয়াত উল্লাহ মৌসুমি ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চামড়া কেনার পর দ্রুত লবণ দিয়ে সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘কোরবানির পর ধাপে ধাপে ট্যানারিগুলোতে চামড়া আসবে এবং মালিকরা সেগুলো ক্রয় করবেন।’
ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘এ বছর প্রায় ১ কোটি পশু কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ চামড়া ট্যানারি মালিকরা সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এ বছর কাঁচা চামড়া সরবরাহ কম হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কোরবানির ঈদের কয়েক দিনে কয়েক গুণ বেশি চাপ তৈরি হয়। সে কারণে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সিইটিপিকে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ট্যানারি মালিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
চামড়া সংগ্রহে ট্যানারিগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিবছর নানা কারণে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। সে হিসেবে আমরা এবার ৮০ থেকে ৮৫ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়েছি। তবে বৃষ্টির কারণে চামড়া সংরক্ষণে বাড়তি সতর্কতা দরকার। পশু জবাইয়ের পর দ্রুত চামড়া ছাড়িয়ে সঠিকভাবে লবণ দিতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।’
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আশরাফ উদ্দিন আহমদ খান বলেন, ‘প্রতিবছর কিছু প্রস্তুতি নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। গত বছর ২০ শতাংশের বেশি চামড়া নষ্ট হয়েছে। এবারও অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির কারণে ঝুঁকি রয়েছে। সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।’
