হরমুজে জাহাজে ঈদের নামাজ পড়লেন ৩১ বাংলাদেশি নাবিক

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

হরমুজ প্রণালিতে প্রায় তিন মাস ধরে আটকে আছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন নাবিকের সবাই বাংলাদেশি।

গত ঈদুল ফিতর জাহাজেই কেটেছে এই ৩১ নাবিকের। বুধবার ঈদুল আজহাও (স্থানীয় সময়) তাঁদের কাটাতে হলো সাগরে ভাসমান জাহাজে। সব মিলিয়ে এক দুঃসহ ও চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তাঁদের।

যদিও বিএসসি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, জাহাজের নাবিকেরা সবাই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন এবং সুস্থ আছেন। জাহাজে থাকা নাবিকেরাও জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি রয়েছে। তবে সার্বক্ষণিক মাথার ওপর মিসাইল ও ড্রোন হামলার শঙ্কা এবং তীরে নামার সুযোগ না থাকায় একধরনের মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকলেও স্বস্তিতে নেই কেউ। জাহাজে থাকা এক নাবিক জানান, সাগরে মাসের পর মাস ভেসে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁদের আছে। একবার যাত্রা শুরু করলে অনেকে দেশে ফেরেন ছয় মাস পরে। তারপরও এবারের অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে একদম নতুন। কারণ, এর আগে তাঁরা কখনো এমন যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি।

জাহাজে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাবিক বলেন, ‘পরিবার থেকে দূরে পরপর দুটা ঈদ কাটানো অনেক কষ্টকর। এটা কাউকে বোঝানো যাবে না। এখানে ভালো খাবারসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তারপরেও পরিবারের জন্য সারাক্ষণ উৎকণ্ঠা কাজ করে। দেশের মানুষ ও পরিবারও আমাদের জন্য সারাক্ষণ চিন্তা করছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর এম মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘সাগরে ভেসে থাকার অভিজ্ঞতা নাবিকদের কাছে নতুন নয়। জাহাজে নাবিকেরা সবাই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। সবাই সুস্থ আছেন এবং তাঁদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। জাহাজটি নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’

বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে পণ্য বহন করে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে বাংলার জয়যাত্রা। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি। এর পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ফলে ওই অঞ্চলেই আটকা পড়ে জাহাজটি।

গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে জাহাজটি থেকে পণ্য খালাস শেষ হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, এরপর এটি কুয়েতের একটি বন্দরে নতুন করে পণ্য বোঝাই করার কথা ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদে জাহাজটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি।

চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনার পর জাহাজটি বের করে আনা সম্ভব হবে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির মুখ পর্যন্ত গিয়েও বারবার ফেরত আসতে হচ্ছে তাঁদের। সর্বশেষ গত ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করে বাংলাদেশি জাহাজ জয়যাত্রা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর জাহাজটি সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে রওনা দিয়ে প্রায় ৪০ ঘণ্টা চালিয়ে হরমুজের কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর ইরান সরকারের কাছে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি চাইলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি ঘুরিয়ে নিয়ে আবারও নিরাপদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনাসাকার বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর করা হয়। বর্তমানে ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে জাহাজটির দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অথবা মোজাম্বিকে যাওয়ার কথা থাকলেও তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *