✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
ইতালির ভেনিস শহরে অভিনেত্রী ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় সংসদে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী।
একই সঙ্গে এ ঘটনায় ইতালি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ জানতে চেয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ প্রতিবাদ জানান।
বিকাল সাড়ে ৩টায় ডিপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে শুরু হয়।
পয়েন্ট অর্ডারে দাঁড়িয়ে জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, বিষয়টি হয়ত পয়েন্ট অব অর্ডারের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একটি বিষয়।
এ কারণে সংসদের বিশেষ ক্ষমতাবলে বিষয়টি তুলে ধরার সুযোগ চান তিনি।
এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, বাংলাদেশের একজন গুণী অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন চলচ্চিত্রসংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইতালির ভেনিসে গিয়েছিলেন। গতকাল তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে বিষয়টি জানিয়েছেন। বিভিন্ন মাধ্যমেও এ বিষয়ে জানা গেছে।
তিনি বলেন, বাঁধন পরিবারের সদস্য ও ছোট সন্তানকে নিয়ে একটি পার্কে হাঁটছিলেন। এ সময় তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ ও মৌখিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে।
‘অত্যন্ত খারাপ ভাষায় তার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এর পেছনে একমাত্র কারণ, তিনি একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’ এবং ২৪ জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, একজন নারী ও দেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন শিল্পীর ওপর এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে না থাকলেও পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় তারা আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে পারবে এবং একজন নারীর ওপর হামলা চালাতে পারবে।
তিনি বলেন, ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে হামলাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এখন তিনি জানতে চান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ কীভাবে নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে সরকারি দলের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী (সংরক্ষিত নারী আসন-২৭) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন (রংপুর-৪) বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনতে ইতালীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ভেনিসে জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাটি ইতালীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মঙ্গলবার বিকালে আমি বাঁধনের সঙ্গে কথা বলেছি এবং এ বিষয়ে আমাদের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছি। স্থানীয় পুলিশ ঘটনাটির বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমাদের দূতাবাস ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জোরালোভাবে তুলে ধরবে।”
জাতীয় সংসদে মঙ্গলবার দুই সংসদ সদস্য বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলে তার জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, “আজ সকালে আমি পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি, বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছি এবং কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে আমরা ইতালীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে এবং বাঁধনকে সর্বোচ্চ কনস্যুলার সহায়তা দিতে পারি।”
তিনি বলেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বাঁধন তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও চার বছর বয়সী এক শিশুকে নিয়ে ভেনিসের একটি পার্কে হাঁটছিলেন। এ সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী ও সন্ত্রাসী একটি দল তার ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোমে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং মিলানে বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল বাঁধনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং তাকে প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা ও সহযোগিতা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ঘটনার পর ভেনিস পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিয়েছে এবং বাঁধন ইতালীয় পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করবেন।
তিনি আরও বলেন, ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছেও তুলে ধরবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, এ ঘটনায় বাঁধনকে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করবে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগ্য নেতৃত্বে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত এই সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া, রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুট এবং মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনতে কোনো দ্বিধা করবে না।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভূমিকার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, খুব শিগগিরই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যা দেশের জন্য গর্বের বিষয়।
তিনি বলেন, “আজ বাংলাদেশের জন্য গর্বের দিন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছি। বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আর কোনো দেশের অধীনতা মেনে নেবে না এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজস্ব গতিপথে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আর কোনো দেশের দাসত্ব বা গোলামী করবে না। বাংলাদেশ তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে।”
এর আগে সংসদে দেওয়া তার প্রথম বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার জন্য এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তিনি সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের অভিনন্দন জানান।
তিনি আরও বলেন, সরকার বাঁধনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করবে।
পরে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন পয়েন্ট অব অর্ডারে বলেন, বাংলাদেশের একজন অতি পরিচিত অভিনেত্রীর ওপর বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বর্বর হামলা চালিয়েছেন। হামলা করার সময় বাঁধন যে জুলাইয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেটাকেই তাঁর দোষ হিসেবে তাঁরা উপস্থাপন করেছেন।
আখতার হোসেন আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি যখন জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, তখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তিনি জানতে চান, এ অবস্থায় এসব হামলাকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সরকারের কোনো পরিকল্পনা, পদক্ষেপ আছে কি না।
