বারিধারায় ফুটপাতে যুবককে গাড়িচাপা, কিশোর আটক

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা যুবককে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরকে বুধবার গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। এর আগে মঙ্গলবার ঘটনাস্থল থেকে তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে জনতা।

তবে এ সংক্রান্ত মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি। বরং গাড়িটির চালক হিসেবে আকাশ মারাক নামে একজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে। 

ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রোটন ব্র্যান্ডের একটি সেডান গাড়ি ফুটপাতে বসে থাকা মেহেদী হাসান মীরকে চাপা দেওয়ার পর দুটি ল্যাম্প পোস্টে ধাক্কা দিয়ে থেমে যায়। এরপর গাড়ির চালকের আসন থেকে কালো টি-শার্ট ও সাদা পায়জামা (ট্রাউজার) পরা এক কিশোর বের হয়ে আসে। চালকের পাশের আসন থেকেও একজন বের হন। দুর্ঘটনার পর ওই কিশোর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে থাকা লোকজন তাকে আটক করে পুলিশে দেন।

ঘটনাস্থল থেকে কিশোর ও গাড়িটিকে থানায় নেওয়া হয়। গাড়ির কাগজপত্র অনুযায়ী, সেটি সিগমা আব্বাস নামে এক নারীর নামে নিবন্ধিত। তাঁর স্বামী আব্বাস আলী শরীফ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন।

গ্রেফতার ১৬ বছর বয়সী কিশোর একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ‘ও’ লেভেলে পড়ে। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। দুর্ঘটনায় দায়ী গাড়িটি তাঁর মায়ের নামে নিবন্ধিত। 

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন বলেন, গাড়িচাপায় মেহেদী হাসান মীর নামে এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা হয়েছে। নিহতের ভাই মুক্তাদির ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। সেখানে গাড়িচালক আকাশ মারাককে আসামি করা হয়েছে। তবে উপস্থিত লোকজন এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দিয়েছেন। গাড়িটি তিনিই চালাচ্ছিলেন বলে দাবি তাদের। এ কারণে কিশোরকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাকে কেন মামলায় আসামি করা হয়নি সেটি বাদী বলতে পারবেন। এ বিষয়ে জানতে বাদীর মোবাইল ফোন নম্বরে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মঙ্গলবার বারিধারা ১ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর নির্মাণাধীন ভবনের বিপরীত পাশের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী হাসান মীর (২৪)। তিনি ওই এলাকায় নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিকেল ৫টার দিকে হঠাৎ বেপরোয়া গতিতে আসা কালো রঙের একটি প্রাইভেটকার ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। পরে আশপাশের লোকজন গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর নিথর দেহ বের করে আনেন। তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বাড়ি নীলফামারীর ডোমার থানার সোনারায় এলাকায়। বাবার নাম এরশাদুল হক, মা মোছা. মিনু।

দুর্ঘটনার সময়ের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফুটপাতে বসে আছেন এক যুবক। নিয়ন্ত্রণ হারানো কালো রঙের একটি গাড়ি হঠাৎ ফুটপাতে উঠে যায়। এতে ওই যুবক গাড়ির চাকায় পিষ্ট হন। পরে গাড়িটি একটি ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা লেগে থেমে যায়। এতে ল্যাম্প পোস্টও ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের আসন থেকে নেমে আসে কালো রঙের টি–শার্ট পরা এক কিশোর। একইসঙ্গে অন্য পাশের দরজা দিয়ে নামেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। এর আগে গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসার সময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজন নিজেদের বাঁচাতে দ্রুত সরে যান। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর গাড়ি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন ওই কিশোরসহ দুজন। তখন কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়। পালিয়ে যান অপরজন। তবে কিশোরই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। 

এদিকে দুর্ঘটনায় দায়ী কিশোরকে পুলিশে সোপর্দ করা হলেও তাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চালানো হয়। পুলিশ কোনো কোনো গণমাধ্যমকে জানায়, মবের শিকার হওয়া থেকে বাঁচাতে কিশোরকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে পরিবারের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। বুধবার বিকেলে জানতে চাইল গুলশান থানা পুলিশ বলে, তাকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ছেড়ে দেওয়ার তথ্য সঠিক নয়।

মায়ের জন্য নতুন ঘর করা হলো না মেহেদির

ঢাকায় নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে আসার আগে মাকে নতুন ঘর করে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন মেহেদী হাসান মীর (২৪)। পরিবারের অভাব ঘোচানোর পাশাপাশি মায়ের জরাজীর্ণ ঘরটি নতুন করে নির্মাণ দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণে হলো না। ঢাকার বারিধারায় বেপরোয়া প্রাইভেট কারের চাপায় প্রাণ গেল মেহেদীর।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের হাজিপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা জানান মেহেদীর মা মিনু বেগম। মেহেদী হাসান ওই গ্রামের এরশাদুল হকের ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মেহেদী হাসান একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। তবে তিনি অন্যের কথা বুঝতে পারতেন। বয়স্ক বাবার সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় পরিবারের হাল ধরতে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। গত সোমবার রাতে এলাকার কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে বাড়ি থেকে রওনা দেন মেহেদী। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার বারিধারায় পৌঁছান তিনি। সেখানে আসরের নামাজ পড়তে বাইরে বের হন। নামাজ শেষে রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এ সময় দ্রুতগতিতে আসা একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতের ওপর উঠে তাকে চাপা দেয়। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় মেহেদীকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে মেহেদী ছিলেন ছোট। বড় ভাই বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। আর মেহেদী বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। বৃদ্ধ বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো পরিবারটিকে। তার ওপর বাড়ির জরাজীর্ণ ঘরটি নতুন করে তৈরি করা ছিল তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। পরিবারের হাল ধরতেই নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে ঢাকায় গিয়েছিলেন মেহেদী। কিন্তু পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আগেই লাশ হয়ে ফিরতে হলো তাকে।

মেহেদীর মা মিনু বেগম বলেন, মাসের শুরু থেকেই ঢাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যেতে চেয়েছিল মেহেদী। কিন্তু খুব রোদ গরম পড়েছে, তাই তাকে যেতে দিইনি। গত সোমবার সে ঢাকায় গেছে। যাওয়ার আগে আমার ছেলে বলেছিল, “মা এবার ঢাকা থেকে ফিরে এসে তোমার জন্য নতুন ঘর করে দেব।” আমার ছেলে ছিল আমার সবকিছু। সে ভালো করে কথা বলতে না পারলেও সবকিছু বুঝত। আমরা গরিব মানুষ, দিন এনে দিন খাই। ভেবেছিলাম ছেলেটা ঢাকায় গিয়ে কিছু আয়-রোজগার করলে আমাদের ভালো চলবে। কিন্তু আমার ছেলেটা মারা গেল। আমার ছেলেকে এভাবে গাড়ি চাপা দিয়ে মারল। আমি এর বিচার চাই।

মেহেদীর মামাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয় বলেন, মেহেদী হাসান মিম একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী। সে কথা বলতে না পারলেও সবকিছু বুঝতে পারত। সে ডোমার সরকারি কলেজে পড়ালেখা করেছে। তার বাবা বৃদ্ধ মানুষ। তেমন আয়-রোজগার করতে পারেন না। যা আয় করেন, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো সম্ভব হয় না। মেহেদী আগে এলাকায় কাজ করত। তা দিয়ে কোনোভাবে সংসারে সহযোগিতা করত। এবার এলাকার কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে আসরের নামাজ পড়ে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এ সময় একটি প্রাইভেট কার তাকে চাপা দেয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়। বুধবার সকালে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসে দাফন করা হয়েছে। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *