বারিধারায় গাড়িচাপায় শ্রমিকের মৃত্যু: ৯ লাখ টাকায় আপস

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎ 

রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণ শ্রমিককে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ৯ লাখ টাকায় আপস মীমাংসা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার কিশোর আজান আলী শরীফের পক্ষে তার আইনজীবী আলমগীর হোসেন শিশু আদালতে এমন একটি আপসনামা জমা দিয়েছেন। এ বিষয়ে দুপুরে শুনানি হবে বলে জানা গেছে।

গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে একটি গাড়ি ফুটপাতে উঠে চাপা দিয়েছিল নির্মাণ শ্রমিক মেহেদী হাসান মীরকে (২৪)।

তিনি ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ গাড়িটি তাকে চাপা দিলে আশপাশের মানুষ ছুটে এসে গাড়ির নিচ থেকে মেহেদীকে রক্তাক্ত অবস্থায় বের করে আনেন। তাকে সঙ্গে সঙ্গে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলেও বাঁচানো যায়নি।

নিহত মেহেদীর বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামে।

মেহেদীকে চাপা দেওয়ার পর দুজন নেমে আসেন গাড়ি থেকে। তখন আশপাশের লোকজন ছুটে এসে একজনকে আটক করে পুলিশে দেন।

তখন ওই কিশোরকে গুলশান পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয়। রাতে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে। ব্যাপক সমালোচনার পর গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ওই কিশোর আজান আলী শরীফেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। 

এর আগে নিহত মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম গুলশান থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, গাড়িটির চালক আকাশ মারক (৪৪) বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মেহেদীকে চাপা দেন। এতে তার মাথা, বুক ও পিঠে গুরুতর জখম হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মেহেদী হাসান মীর একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। তবে তিনি অন্যের কথা বুঝতে পারতেন। বয়স্ক বাবার সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় পরিবারের হাল ধরতে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। গত সোমবার রাতে এলাকার কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে বাড়ি থেকে রওনা দেন মেহেদী। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার বারিধারায় পৌঁছান তিনি। সেখানে আসরের নামাজ পড়তে বাইরে বের হন। নামাজ শেষে রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এ সময় দ্রুতগতিতে আসা একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতের ওপর উঠে তাকে চাপা দেয়। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় মেহেদীকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে মেহেদী ছিলেন ছোট। বড় ভাই বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। আর মেহেদী বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। বৃদ্ধ বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো পরিবারটিকে। তার ওপর বাড়ির জরাজীর্ণ ঘরটি নতুন করে তৈরি করা ছিল তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। পরিবারের হাল ধরতেই নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে ঢাকায় গিয়েছিলেন মেহেদী। কিন্তু পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আগেই লাশ হয়ে ফিরতে হলো তাকে।

মেহেদীর মা মিনু বেগম বলেন, মাসের শুরু থেকেই ঢাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যেতে চেয়েছিল মেহেদী। কিন্তু খুব রোদ গরম পড়েছে, তাই তাকে যেতে দিইনি। গত সোমবার সে ঢাকায় গেছে। যাওয়ার আগে আমার ছেলে বলেছিল, “মা এবার ঢাকা থেকে ফিরে এসে তোমার জন্য নতুন ঘর করে দেব।” আমার ছেলে ছিল আমার সবকিছু। সে ভালো করে কথা বলতে না পারলেও সবকিছু বুঝত। আমরা গরিব মানুষ, দিন এনে দিন খাই। ভেবেছিলাম ছেলেটা ঢাকায় গিয়ে কিছু আয়-রোজগার করলে আমাদের ভালো চলবে। কিন্তু আমার ছেলেটা মারা গেল। আমার ছেলেকে এভাবে গাড়ি চাপা দিয়ে মারল। আমি এর বিচার চাই।

মেহেদীর মামাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয় বলেন, মেহেদী হাসান মীর একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী। সে কথা বলতে না পারলেও সবকিছু বুঝতে পারত। সে ডোমার সরকারি কলেজে পড়ালেখা করেছে। তার বাবা বৃদ্ধ মানুষ। তেমন আয়-রোজগার করতে পারেন না। যা আয় করেন, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো সম্ভব হয় না। মেহেদী আগে এলাকায় কাজ করত। তা দিয়ে কোনোভাবে সংসারে সহযোগিতা করত। এবার এলাকার কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে আসরের নামাজ পড়ে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এ সময় একটি প্রাইভেট কার তাকে চাপা দেয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়। বুধবার সকালে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসে দাফন করা হয়েছে। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *