ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় যা থাকতে পারে

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎  

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত খসড়ায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা, তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ছাড় এবং পারমাণবিক কর্মসূচি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে। 

দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। ইরানি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, খসড়া স্মারকে নিচের বিষয়গুলো আছে:

হরমুজ প্রণালি
ইরান তাৎক্ষণিকভাবে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে।

স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই অবরোধ প্রত্যাহার কার্যক্রম শুরু হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা শেষ করা হবে।

তেল ও আর্থিক বিষয়
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না যুক্তরাষ্ট্র। চূড়ান্ত চুক্তি হলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর আরোপিত জাতিসংঘ ও সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।

নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে তেহরান তেল বিক্রি করে আয় করতে পারবে। এছাড়া ইরানের জব্দকৃত ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড়েও সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে সরাসরি অর্থ স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতা এবং আর্থিক ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে এই পরিকল্পনা নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কথা।

পারমাণবিক কর্মসূচি
সমঝোতার আওতায় তেহরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দেশটি অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং নতুন স্থাপনাও সম্প্রসারণ করবে না।

ভবিষ্যতের একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আওতায় ইরানকে নিজ ভূখণ্ডে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হালকা করার অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এসব বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ও নিষ্পত্তি করা হবে।

উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী রোববারই সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার কথা। তবে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, তেহরান এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা গত শুক্রবার থেকে চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। তাঁরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, কয়েক দিনের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর গত তিন মাসে এ ধরনের আশাবাদ আর কখনো দেখা যায়নি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শুক্রবার এক্সে লিখেছেন, ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে।’ পরে তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যতক্ষণ না সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হচ্ছে, ততক্ষণ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না, কোনো সমঝোতা হয়েছে। চুক্তি ‘দূরবর্তীভাবে’ (ইলেকট্রনিক পদ্ধতি) স্বাক্ষরিত হবে বলেও জানান তিনি।

তবে একই দিন আরাগচির আগে পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোববার (আজ) যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চুক্তি সই হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরান এগিয়ে থাকছে, এমন আলোচনার জবাবে শুক্রবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান যেসব শর্ত ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর ফাঁস করেছে, তার সঙ্গে লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি হয়েছে, তার কোনো সম্পর্ক নেই।’

চুক্তিতে যা থাকছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। ইরানের বন্দর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও দেশটির জব্দ অর্থের কিছু ছাড় দেওয়া হতে পারে।

প্রাথমিক চুক্তিতে পারমাণবিক ইস্যু থাকছে না। তা নিয়ে পরবর্তী ৬০ দিনে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে।

হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রাথমিক সমঝোতায় ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা অন্যত্র স্থানান্তর করতে রাজি হয়েছে। তবে ইরান বলেছে, তাদের ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা কোনো দেশে স্থানান্তর করা হবে না; বরং দেশে রেখেই তার মান কমানো হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে। ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার বৈঠক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। এর পর থেকে তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠকের চেষ্টা চলছিল। শেষ পর্যন্ত দুই দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতিতে নয়, বরং ডিজিটালি চুক্তি সই হবে বলে জানা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন গতকাল জানায়, নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা আগামী ৪ জুলাই (১৯ মহরম) শুরু হবে। ৯ জুলাই মাশহাদে শহরে তাঁকে দাফন করা হবে।

মজুত ইউরেনিয়াম আরও সুরক্ষিত করেছে ইরান

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিরাপদে সংরক্ষণ করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালিয়ে যাতে ইরানের ইউরেনিয়াম ছিনিয়ে নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে কিছু টানেল ধ্বংস করেছে এবং প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন বসিয়ে দিয়েছে তেহরান। ইরানের কাছে সমৃদ্ধ যে ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, তার সক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান থেকে ইউরেনিয়াম কেড়ে নেওয়ার কাজটি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ হয়ে গেছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *